বাংলার নির্বাচন এবং ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন

বাংলার নির্বাচন ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন

২২.০৩.২০২১

২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে ইকনমিক টাইমস কাগজ কর্পোরেট শিবিরের কর্তাদের মধ্যে একটি নির্বাচনী সমীক্ষা করেছিল। মোট ১০০ জন কর্পোরেট কর্তাদের তিন-চতুর্থাংশ উচ্ছ্বাসের সঙ্গে জানিয়েছিলেন তাঁরা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদীকে চান। মাত্র দশ শতাংশ কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর নাম প্রস্তাব করেছিলেন। সুনীল মিত্তাল থেকে গৌতম সিংহানিয়া, রতন টাটা থেকে মুকেশ আম্বানি এক সুরে বলেছিলেন যে তাঁরা ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদীকেই চান। অনিল আম্বানি অত্যুৎসাহে বলেন, মোদী হলেন ‘‘নেতাদের মধ্যে নেতা, রাজাদের মধ্যে রাজা’’। গুজরাটের বহুচর্চিত ‘শিল্পোন্নয়নে’ মোদীর ভূমিকায় ঐ কর্পোরেট প্রধানরা তখন আপ্লুত। গুজরাট গণহত্যায় মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভূমিকা সম্পর্কে যে সব শিল্পপতি একদা কিছু মৃদু প্রশ্ন তুলেছিলেন, তাঁরা তখন স্মৃতিভ্রংশ। তাঁরা উদ্বাহু হয়ে মোদীর জয়গান গেয়ে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী পদে অভিষিক্ত দেখতে তখন উৎগ্রীব। প্রকৃতপক্ষে, ভারতীয় শাসনব্যবস্থার ঊর্ধ্বতম নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস)-এর একনিষ্ঠ এক প্রচারককে ক্ষমতাসীন করতে সংখ্যাগুরু কর্পোরেট নেতাদের অধিকাংশের কোনও দ্বিধা ছিল না। ইকনমিক টাইমস জোরের সঙ্গে বলেছিল, কর্পোরেট নেতারা ‘‘এক শক্তিশালী নেতৃত্ব, অভিপ্রায়, সিদ্ধান্ত এবং তৎপরতার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছে’’। ভারতের শাসকশ্রেণি আসলে কী চেয়েছিল তা উপরোক্ত কথাগুলি থেকে স্পষ্ট হওয়ার কথা।

গত ছয়-সাত বছরে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। শুধু প্রধানমন্ত্রী পদে নয়, রাষ্ট্রপতি, উপ-রাষ্ট্রপতি, লোকসভার অধ্যক্ষ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, এমনকি ২০১৪ ও ২০১৯ সালে যে কেন্দ্রীয় সরকার গঠিত হয়েছে তার বেশ কিছু মন্ত্রী ছিলেন আরএসএস-এর স্বয়ংসেবক। যেমন ২০১৯ সালে গঠিত মন্ত্রীসভার প্রতি চারজন বিজেপি মন্ত্রীর মধ্যে তিনজন হলেন আরএসএস থেকে আগত। সংসদে ৩০৩ জন বিজেপি সাংসদের মধ্যে ৪৮ শতাংশই হলেন আরএসএস প্রতিনিধি। বেশ কয়েকটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্যপালের শিকড় সঙ্ঘের মধ্যে প্রোথিত। প্রকৃতপক্ষে এখন সরকার তথা দেশ চালাচ্ছে ফ্যাসিবাদী আরএসএস, এমন কথা বোধহয় বাহুল্য নয়। ২০১৪ সালে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর মন্ত্রীরা যে সব আমলাদের নিযুক্ত করেছিলেন, তাঁরা আরএসএস দপ্তরে তাঁদের আনুগত্য প্রকাশের জন্য দৌড়ে গিয়েছিলেন এমন খবরও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। বস্তুত, নানা ধরনের সরকারি পদ – শিক্ষা, ইতিহাস লিখন, পুরাতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, স্বাস্থ্য, স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, শিল্প, শ্রমদপ্তর, ইত্যাদিতে সঙ্ঘ ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা আলোকিত করে আছেন এমন খবরের সবটা রটনা নয়। বছর তিনেক আগে কংগ্রেসের নেতা ও সুপ্রিম কোর্টের নামকরা আইনজীবী কপিল সিবাল মন্তব্য করেছেন যে, সরকার যেভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে আরএসএস ঘনিষ্ঠদের নিয়োগ করেছে, একই ভাবে তারা বিচারবিভাগেও আরএসএস মতাদর্শবাহী ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছে। দেশ কোনদিকে চলেছে তার আন্দাজ এখান থেকে নিশ্চয় কিছুটা পাওয়া যায়।

বড় বুর্জোয়া ফ্যাসিবাদী বিজেপির আঁতাত

ফ্যাসিবাদী সঙ্ঘ পরিবারের রাজনৈতিক ফ্রন্ট বিজেপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে আঁতাতবদ্ধ হতে ভারতীয় বড়-ছোট বুর্জোয়াদের কোনও দ্বিধা হয়নি। শ্রমিক-কৃষকদের দমিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বিজেপি-ই সবচেয়ে সাচ্চা তা বুঝতে তাদের সময় লাগেনি। একই রকম ঘটনা ঘটেছিল ১৯৩০-৪০-এর দশকে জার্মানিতে। ফ্যাসিবাদী নাৎসি পার্টির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছিল সেখানকার একচেটিয়া পুঁজিপতি। কায়েম হয়েছিল চরম ফ্যাসিস্ত হিটলারি জমানা। ভারতে পরপর দু’টি লোকসভা নির্বাচনে ফ্যাসিবাদী বিজেপি সরকার গঠন ভারতকে কোন দিকে নিয়ে চলেছে তা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। এই সরকার বড় বুর্জোয়াদের স্বার্থে তামাম শ্রমিক-কৃষক জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে দিয়েছে। চরম হিংস্রতার সঙ্গে পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থে শ্রম আইন ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে। শ্রমিকদের শ্রেণিসংগ্রাম না থাকা অবস্থায় এই যুদ্ধ ঘোষণা শুধু বিপুল অসম তো বটেই, এমনকি ‘স্বাধীনতা’র পর শ্রমিকরা কোনওদিন এতখানি কোণঠাসা হয়নি। বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে যে বিপুল পরাজয় ঘটে গেছে, শ্রমিকরা এখনও তার ধাক্কায় পিছু হটছে। প্রায় বিনা প্রতিরোধে চরম শ্রমিক-বিরোধী শ্রম আইন চালু হয়ে গেছে। ফ্যাসিবাদী জার্মানিতে শ্রমিকদের শক্তিশালী ইউনিয়নগুলিকে হিটলারি জমানা ভেঙ্গে তছনছ করে দিয়েছিল। একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থে শ্রমিকদের ন্যূনতম প্রতিবাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। নাৎসি পার্টির একটি মাত্র ইউনিয়ন সমস্ত শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব করত এবং একচেটিয়া পুঁজির দাসত্ব করত। ভারত কি সেই দিকে এগোচ্ছে?

একই রকম হিংস্রতার সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকার তিনটি কৃষি বিলের মাধ্যমে কৃষকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। চলমান কৃষক আন্দোলনকে ধ্বংস করার জন্য তারা যেভাবে ধর্নাস্থলে কাঁটাতার ও কংক্রিটের বেড়াজাল নির্মাণ করেছে তা ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলের সন্ত্রাসের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। সরকার খুল্লামখুল্লা প্রমাণ করে দিচ্ছে যে তারা প্রকৃতপক্ষে ভারতের কর্পোরেট ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে ভারতীয় কৃষিব্যবস্থাকে শোষণের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে বদ্ধপরিকর।

বিজেপি সরকার একদিকে ‘আত্মনির্ভর’ ভারত গড়ে তোলার আওয়াজ দিচ্ছে, অন্যদিকে কয়েকটি মাত্র ক্ষেত্রকে সরকারি মালিকানায় রেখে বাকি সব ক’টি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প/প্রতিষ্ঠানকে বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী এবং দেশীয় বেসরকারি পুঁজির কাছে বেচে দেওয়া বা উন্মুক্ত করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে। তিনশোর বেশি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান না কি মাত্র দু’ডজনে নেমে আসবে! বাকি সব স্রেফ বেচে দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, ব্যবসা করা না কি সরকারের কাজ নয়! হিটলারের জার্মানি ও মুসোলিনির ইতালিও সরকারি সম্পত্তি ও ব্যবসা একচেটিয়া পুঁজির হাতে তুলে দিয়েছিল। মুসোলিনি ঘোষণা করেছিলেন, ‘‘ফ্যাসিবাদী ক্ষমতা সমগ্র জাতীয় অর্থনীতির জাতীয়করণ বা নিম্নস্তরের আমলাতান্ত্রিকিকরণ চায় না।… কর্পোরেশনগুলি শৃঙ্খলা দেবে এবং রাষ্ট্র শুধু প্রতিরক্ষা, দেশের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে।’’ বস্তুত, নয়া-উদারনীতি বর্তমানে যে বেসরকারিকরণের ঢেউ তুলেছে, তার প্রথম ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল ফ্যাসিবাদী জার্মানি ও ইতালিতে।

এদিকে দেশে বেকারির হার আকাশছোঁয়া। কোভিড সংকটের আগেই তা রেকর্ড করে ফেলেছিল। বিজনেস স্টান্ডার্ড জানিয়েছে, ২০১৭-১৮ সালে বেকারির হার ছিল গত ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০১৭-১৮ সালে ভোগ্যপণ্য ব্যবহার করার ক্ষমতা ১৯৭০ দশকের পর্যায়ে নেমে গেছে। ২০১১-১২ সালে গরিবরা মাথাপিছু যতটুকু খাদ্য ক্রয় করত, ২০১৭-১৮ সালে সেই ক্ষমতা তার থেকেও কমে গেছে।১০ সরকারি দান-খয়রাতি দিয়ে অতি-গরিব পরিবারগুলির কোনও সুরাহা হওয়ার কথা নয়, তা হয়ও নি। জ্বালানির দাম অগ্নিমূল্য। অত্যাবশ্যক পণ্যের দাম হু হু করে বাড়ছে। করোনার থাবা এই সংকটগুলিকে সুগভীর করে তুলেছে।

২০১৪ সালের নির্বাচনে ফ্যাসিবাদী বিজেপি ফিরি করেছিল ‘অচ্ছে দিন’-এর সুখস্বপ্ন। হিটলারও ঘোষণা করেছিল এক ‘নতুন ও গৌরবময়’ জার্মানি গড়ে তোলার কথা। সেই ‘অচ্ছে দিন’-এর স্বপ্ন কিংবা হিটলারি স্বপ্ন কোনওটাই বাস্তবায়িত হয়নি। এখন বাংলার নির্বাচনের আগে নির্লজ্জের মতো বলছে তারা না কি ‘সোনার বাংলা’ গড়ে দেবে। প্রতিটি জনসভা, সোশ্যাল মিডিয়া, খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনে দেদার অর্থ ব্যয় করে বাংলাকে ফ্যাসিস্তরা বারবার জানাচ্ছে এই ‘সোনার বাংলার’ কথা। প্রচার, কথার জোর, মিথ্যা কথার চাষ – এগুলি হল ফ্যাসিবাদী শক্তির অন্যতম অস্ত্র। নাৎসিবাদী হিটলার বলেছিলেন, ‘‘জনগণের বৃহৎ অংশকে ভাষণের ক্ষমতায় নাড়িয়ে দেওয়া যায়’’।১১ গোয়েবলস অজস্রবার মিথ্যার প্রচার করে জনমতকে ফ্যাসিস্ত শাসনের পক্ষে কীভাবে জয় করত তার কাহিনী নানা রচনায় বিধৃত। ভারতে, বিশেষত বাংলায় এখন তারই কুৎসিত প্রদর্শন চলছে।

নাগরিক কারা? সঙ্ঘ পরিবার কী বলছে?

সঙ্ঘ পরিবার তথা বিজেপি বলে থাকে, ভারতের হিন্দুরা না কি আর্যদের উত্তরসূরী। এই আর্যরা চেহারায়-আকারে-প্রকৃতিতে এবং সংস্কৃতিতে না কি বিশ্বশ্রেষ্ঠ। বিশেষত উত্তর ভারতীয় হিন্দু ব্রাহ্মণরা না কি আর্যদের বংশধর। মুসলমান-খ্রিস্টানরা হল বহিরাগত। আশ্চর্যজনক হল এই কথার প্রতিধ্বনি শোনা গিয়েছিল জার্মানির নাৎসিদের কণ্ঠেও। তারাও বলেছিল জার্মানি ও উত্তর ইউরোপের মানুষরা হল আর্য এবং তারাই সর্বশ্রেষ্ঠ। পূর্ব ইউরোপীয় স্লাভ ও বাল্টিক এবং সোভিয়েত রাশিয়ার এশিয়া বংশভূত মানুষরা হল নিম্ন স্তরের। ইহুদিরা বহিরাগত ও ঘৃণ্য। সুতরাং হয় তাদের তাড়াও কিংবা তাদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চল, ঘেটোবন্দী করে রাখ, তাদের সঙ্গে বিবাহ নিষিদ্ধ কর।

মুসলমান ও ইহুদিদের প্রসঙ্গে পরে আসা যাবে। ভারতে ঐ তথাকথিত আর্যরা (বা ‘হিন্দু ব্রাহ্মণ’রা) যে বর্ণপ্রথা অনুসরণ করে, সঙ্ঘ পরিবার তথা বিজেপি তার ঘোর সমর্থক তো বটেই, উপরন্তু তারা এই বর্ণপ্রথা টিকিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর। আরএসএস-এর দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক গোলওয়ালকর বর্ণব্যবস্থাকে সমর্থন করে বলেছিলেন, ‘‘আজ আমরা অজ্ঞতাবশত বর্ণব্যবস্থাকে ছোট করার চেষ্টা করি।… সমাজে কিছু লোক বুদ্ধিজীবী হন, কেউ কেউ উৎপাদনে এবং সম্পদ অর্জনে পারদর্শী এবং কারও কারও শ্রমদানের সামর্থ্য থাকে। আমাদের পূর্বপুরুষরা সমাজে এই চারটি মূল বিভাজনকে দেখতে পেয়েছিলেন।’’১২ লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লা বলেছেন, ‘‘ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় সবসময় অন্যান্য সব সম্প্রদায়কে চালনা করে এবং এই দেশে তারা সবসময়ে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে।… ব্রাহ্মণরা জন্মসূত্রে সমাজে সবচেয়ে উপরে থাকে।’’১৩ সুতরাং বাংলায় আরএসএস তথা বিজেপি জয়লাভ করলে ব্রাহ্মণ্যবাদ তথা বর্ণব্যবস্থাকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে। ব্রাহ্মণরাই অন্যান্য বর্ণকে ‘চালনা’ করবে, ‘পথ দেখাবে’। প্রকৃতপক্ষে, বাংলার কয়েক কোটি শূদ্র ও অতিশূদ্র (দলিত) যে যেখানে আছে, সেখানেই থেকে যাবে বা তাদের অবস্থার আরও অবনতি হবে।

তবে, বর্ণব্যবস্থা বাংলার নির্বাচনে তেমন কোনও ইস্যু হয়ে ওঠেনি। এই বর্বর ব্যবস্থা অনড় থেকে যাবে এমনটাই যেন সরল স্বাভাবিক ব্যাপার। মূল কথাটা হল নাগরিকত্ব প্রশ্ন। প্রশ্নটা খুব জটিল। এই স্বল্প পরিসরে নাগরিকত্ব প্রশ্ন ও হিন্দুত্ববাদীদের পরিকল্পনা সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করা যাবে না। পরের কোনও একটি পর্বে সে সম্পর্কে আমরা আলোচনা করব। কিন্তু এই দেশের নাগরিক কারা? যারা অবিভক্ত ভারতবর্ষের অধিবাসী ছিল স্বাভাবিকভাবে তারা ও তাদের সন্তান-সন্ততিরাই তো নাগরিক। যেমন, যে ‘আর্যরা’ (যাদের সঙ্ঘ পরিবার ‘হিন্দু’ বলে থাকে) কয়েক হাজার বছর আগে এই ভূখণ্ডে এসেছে তারা সবাই নাগরিক। কিংবা ‘শক হুণ পাঠান মোগল’, যারা মুসলমান, যারা প্রায় এক হাজার বছর আগে এই ভূখণ্ডে পদার্পণ করে এখানকার জনসাধারণের সঙ্গে মিশে গেছে তারা সবাই স্বাভাবিকভাবে নাগরিক। কিংবা, যারা ধর্মান্তরিত হয়েছে তারাও নাগরিক। ভারত ভূখণ্ডের আদিবাসী ও দ্রাবিড় – এরাও নাগরিক। কিন্তু এই সহজ সরল ব্যাখ্যা বিজেপির মতো হিন্দুত্ববাদীদের একেবারে না-পসন্দ। তাদের কথা হল, খ্রিস্টান ও মুসলমানদের নাগরিকত্বের পরিচয় দিতে হবে কেননা তারা না কি ‘বহিরাগত’। বাকিদেরও যথাযথ পরিচয় দিতে হবে কেননা কে কোথা থেকে এ দেশে এসেছে তা জানা না কি জরুরি, ভারতবর্ষ না কি ‘‘সরাইখানা’’ নয়। সঙ্ঘ পরিবারের গুরু গোলওয়ালকর বলে গেছেন,

বহিরাগতদের কাছে একমাত্র দু’টি পথ খোলা আছে – হয় তাদের দেশের জাতির [অর্থাৎ হিন্দুদের] সঙ্গে মিশে যেতে হবে, তাদের সংস্কৃতিকে গ্রহণ করতে হবে, অথবা দয়া ভিক্ষা করে থাকতে পারবে ততক্ষণই, যতক্ষণ সে দেশের জাতি [অর্থাৎ হিন্দুরা] তা দিতে রাজি থাকে – নচেত সে দেশের জাতি যখনই চাইবে তখনই সে দেশ ত্যাগ করতে হবে।… তারা এ দেশে থাকতে পারে হিন্দু জাতির প্রতি সম্পূর্ণ অধীনতা দেখিয়ে – কোনও কিছু দাবি করা চলবে না, কোনও আনুকুল্যের আশা করা যাবে না, পক্ষপাতমূলক কোনও ব্যবহার দূরের কথা, এমনকি নাগরিক অধিকারটুকুও তাদের থাকবে না।১৪

অর্থাৎ হিন্দুদের সংস্কৃতিকে গ্রহণ করতে না পারলে, তাদের সঙ্গে মিশে যেতে না পারলে তাদের ‘দেশ ত্যাগ’ করতে হবে, কিংবা তাদের ‘নাগরিক অধিকারটুকুও’ থাকবে না। হিন্দুত্ববাদীদের কথার মূল মর্মবস্তু এটাই। অথচ আর্যরাও যে ভারত ভূখণ্ডের বাইরে থেকে এখানে পদার্পণ করেছিল সে সত্যকে তারা মুছে দিতে চায়। প্রকৃত অর্থে আদিবাসীরাই তো ভারত ভূখণ্ডের আদি বাসিন্দা, তাই না?

আশ্চর্যজনক ভাবে হিন্দুত্ববাদীদের এই বার্তার প্রতিধ্বনি শোনা গিয়েছিল জার্মানির নাৎসি পার্টির কণ্ঠে। তারা বলেছিল, ইহুদি, জিপসি, রাশিয়ার এশিয়ান, পোল, ইত্যাদিদের হয় জার্মানির ‘আর্যদের’ কাছে দয়া ভিক্ষা করে থাকতে হবে, অথবা তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করা হবে। বস্তুত, তাদের বহুজনকে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে অমানুষিক অত্যাচার করা হয়েছিল এবং গ্যাস চেম্বারে মেরে ফেলা হয়েছিল। তারা সগর্বে ঘোষণা করেছিল, ‘‘যাদের দেহে জার্মান রক্ত আছে, বিশ্বাস নিরপেক্ষ ভাবে তারা নাগরিক। সুতরাং কোনও ইহুদি নাগরিক নয়।’’১৫ এগুলো নিছক কথার কথা ছিল না। নাৎসিরা তা কীভাবে প্রয়োগ করেছে তা ইতিহাসে কালো অক্ষরে লেখা আছে। ভারতেও নানা স্থানে ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি হচ্ছে। সেগুলি কি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের নামান্তর?

প্রকৃতপক্ষে, সঙ্ঘ পরিবারের গুরু গোলওয়ালকর হিটলারের জার্মানি যে কাজ করেছিল তার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে গেছেন। তিনি বলেছেন,

জার্মান জাতীয় গরিমা আজ সবার কাছে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে। জাতির ও সংস্কৃতির পবিত্রতা রক্ষা করার জন্য জার্মানি তাদের দেশ থেকে সেমিটিক জাতি ইহুদিদের বিতাড়ন করে বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছে।… হিন্দুস্থানে আমাদের কাছে তা এক ভাল শিক্ষা যা আমাদের শিখতে হবে…।১৬

হিটলারের জার্মানি থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা ফ্যাসিস্ত হিন্দুত্ববাদীরা এখানে প্রয়োগ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাই তো সিএএ, এনআরসি, এনপিএ ইত্যাদির এত আয়োজন। ‘সোনার বাংলা’ গড়ার গেরুয়া প্রতিশ্রুতির অন্তরালে তো এই কথাগুলিই লেখা আছে, তাই না?

হিন্দু রাষ্ট্রের দিকে

ভারতের সংবিধানে যেটুকু ছিঁটেফোঁটা গণতন্ত্র আছে, তাও সঙ্ঘ পরিবার বরদাস্ত করতে পারছে না। প্রকৃতপক্ষে তারা ভারতের সংবিধানকে পরিবর্তন করে দেশে এক হিন্দু রাষ্ট্র স্থাপন করতে চায়।

২০১৯ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মন্তব্য করেছেন, ‘‘স্বাধীনতার ৭০ বছর পরে মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে, বহুদলীয় সংসদীয় ব্যবস্থা আসলে ব্যর্থ কি না…’’।১৭ ওনার বক্তব্য থেকে পরিষ্কার যে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তে একদলীয় শাসন, অর্থাৎ স্বৈরতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা করতে তাঁরা খুবই উৎসুক। তাঁরা এখন জল মাপছেন, অপেক্ষা করছেন, পরিকল্পনা ভাঁজছেন কীভাবে ভারতের সংসদীয় দলগুলিকে তুলে দিয়ে বিজেপির একদলীয় স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায়। আশঙ্কা অমূলক নয়। কৃষি-শিক্ষা কেন্দ্র-রাজ্যের যৌথ দায়িত্বে আছে। তবু রাজ্যগুলিকে অন্ধকারে রেখে চালু হয়ে গেল কৃষি ও শিক্ষা বিল। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ফ্যাসিবাদী বিজেপি ক্রমে ক্রমে ভেঙ্গে ফেলার দিকে এগোচ্ছে। অতি সম্প্রতি সংসদে সরকার এক বিল এনেছে যার মর্মার্থ হল দিল্লি সরকারের মাথায় বসে থাকা লেফটেন্যান্ট গভর্নরই হবে প্রকৃত সরকার! ১৯৬১ সালে ন্যাশনাল ইন্টিগ্রিটি কাউন্সিলের প্রথম অধিবেশনে গোলওয়ালকর জানিয়েছিলেন,

বর্তমানের যুক্তরাষ্ট্রীয় ধরনের সরকার শুধু বিচ্ছিন্নতাবাদেরই জন্ম দেয় না… তা এক নেশনকে স্বীকার করতে প্রত্যাখ্যান করে। একে সম্পূর্ণভাবে উৎপাটিত করতে হবে, সংবিধানকে বিশুদ্ধ করতে হবে এবং এককেন্দ্রিক ধরনের সরকার স্থাপন করতে হবে।১৮

বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট। ফ্যাসিবাদী সঙ্ঘ পরিবারের অ্যাজেন্ডাতে স্বৈরতান্ত্রিক সরকার স্থা্পনের লক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত। নাৎসিবাদী জার্মানিতে প্রাদেশিক, আঞ্চলিক সরকারগুলি এবং পুরসভাগুলিকে গ্রাস করে একদলীয় এবং একনায়কত্বাধীন সরকার স্থাপন করা হয়েছিল।১৯ ভারতও কি সেদিকে এগোচ্ছে?

২০১৯ সালে আরএসএস ও বিজেপির অন্যতম নেতা রাম মাধব বলেছেন, ‘‘… এক শক্তিশালী কর্তৃত্বময় নেতৃত্ব … বিশ্ব রাজনীতিতে শুরু হয়েছে।… ভারতেও এই ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।’’২০ এখানেও তাদের বক্তব্য অত্যন্ত পরিষ্কার। তারা চায় ‘‘এক শক্তিশালী কর্তৃত্বময় নেতৃত্ব’’ যা ভারতে পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে। ভারতে যে এক জবরদস্ত কর্তৃত্বময় শাসন চলছে তা শ্রমিক-কৃষক জনগণের উপর হামলা, মুসলমান সম্প্রদায়কে সন্ত্রস্ত করে রাখা, শূদ্র-অতিশূদ্র জনগণের উপর উঁচু বর্ণের দাপটকে আরও তীব্র করে তোলা, ‘দেশদ্রোহী’ তকমা মেরে জেলে পচানো, বাক-স্বাধীনতাকে শৃঙ্খলিত করার প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট।

জার্মানিতে নাৎসি শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাধ্যমে স্থাপিত হয়েছিল এক কর্তৃত্ববাদী ও সামগ্রিকতাবাদী (totalitarian) ফ্যাসিবাদী শাসন। ১৯৩৩ সালে নাৎসি শাসন প্রতিষ্ঠিত করে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়, বাক-স্বাধীনতা, পত্রিকা প্রকাশের স্বাধীনতা, জমায়েত হওয়ার স্বাধীনতা, অর্থাৎ এককথায় ব্যক্তিগত স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়। প্রতিবাদী ও বিরোধীদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে ভয়াবহ পরিস্থিতিতে অমানুষিক অত্যাচারের মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়, গ্যাস চেম্বারে খতম করে দেওয়া হয়। সামগ্রিকতাবাদী শাসনের অর্থ ছিল প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের অনুপ্রবেশ। যেমন, আপনি কী খাবেন, কাদের সঙ্গে মিশবেন, কীভাবে জীবনযাপন করবেন, কাকে ভালবাসবেন….. ইত্যাদি। রাম মাধবের কথায় কি তারই পূর্বাভাস ধ্বনিত?

১৯৯৩ সালের ১ জানুয়ারি আরএসএস একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে দাবি করেছিল দেশের সংবিধান হল ‘‘হিন্দু-বিরোধী’’। শ্বেতপত্রের ভূমিকায় স্বামী হীরানন্দ লিখেছিলেন, ‘‘সংবিধান দেশের চরিত্র, পরিস্থিতি ও অবস্থার সঙ্গে বেমানান’’।২১ ১৯৯২ সালে উগ্র হিন্দু ঝটিকা বাহিনীর হাতে বাবরি মসজিদ ধ্বংস হওয়ার পর স্বামী মুক্তানন্দ ‘‘হিন্দু-বিরোধী সংবিধান’’কে প্রত্যাখ্যান করার আহ্বান জানান।২২ ১৯৯৩ সালের জানুয়ারি মাসে আরএসএস নেতা রাজেন্দ্র সিং (যিনি কিছু পরে সঙ্ঘপ্রধান হন) বলেন, সংবিধানের ‘‘সরকারি ভাষ্যে ‘মিশ্র সংস্কৃতির’ উল্লেখ আছে। কিন্তু আমাদের নিশ্চিতভাবে কোনও মিশ্র সংস্কৃতি নেই।… এই সমস্ত কিছু দাবি করে সংবিধানে পরিবর্তন প্রয়োজন।’’২৩ তাঁদের বক্তব্য অত্যন্ত পরিষ্কার। ভারতের সংবিধান ‘‘হিন্দু-বিরোধী’’। ভারতে যে নানা ধর্ম, নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধানের অস্তিত্ব আছে, তারা সেগুলিকেও অস্বীকার করে হিন্দু-হিন্দি একশিলীভূত সংস্কৃতি চাপিয়ে দিতে চায়। সুতরাং সংবিধানকে হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ অনুযায়ী পরিবর্তন করা তাদের অ্যাজেন্ডায় আছে।

প্রকৃতপক্ষে, সংবিধানকে হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ অনুযায়ী পুনর্লিখন করে তারা দেশে একটি ফ্যাসিবাদী হিন্দু রাষ্ট্র স্থাপন করতে চায়। সঙ্ঘপ্রধান মোহন ভাগবত বলেছেন, ‘‘হিন্দুস্থান হল একটি হিন্দু রাষ্ট্র, যা একটি সত্য। আমরা এই [ধারণা] নিয়ে এগিয়ে চলেছি। এই নেশনকে মহান করে তুলতে সমস্ত হিন্দুদের সংগঠিত করতে হবে।… এটাই সঙ্ঘের কাছে উপযুক্ত সময়।’’২৪ ২০১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর মোহন ভাগবত পুনর্বার বলেন, ‘‘ভারত হল একটি হিন্দু রাষ্ট্র এবং তা মীমাংসিত সত্য।’’২৫ সঙ্ঘ প্রধানের কথায় এইভাবে ধ্বনিত হয়েছে আগামী দিনের পূর্বাভাস।

সংবিধান পরিবর্তন বা হিন্দু রাষ্ট্র স্থাপন করে সঙ্ঘ দেশে কোন ধরনের শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে চায় তার কিছুটা আন্দাজ করা যায় সঙ্ঘ পরিবারের আরও কিছু বক্তব্য থেকে। প্রকৃতপক্ষে, তারা মনে করে মনুস্মৃতিই হল হিন্দু রাষ্ট্রের পক্ষে উপযোগী সংবিধান। সংবিধান প্রস্তুত হওয়ার চারদিন পর ১৯৪৯ সালের ৩০ নভেম্বর সঙ্ঘের ইংরেজি মুখপত্র অর্গানাইজারে সম্পাদকীয় কলমে লেখা হয়,

ভারতের নতুন সংবিধানের সবচেয়ে খারাপ বিষয়টি হল যে এর মধ্যে ভারতীয়ত্ব বলে কিছু নেই।… তার মধ্যে সনাতন ভারতীয় সাংবিধানিক আইনকানুন, প্রতিষ্ঠান, পরিভাষা ও শব্দবিন্যাসের কোনও চিহ্নমাত্র নেই।… প্রাচীন ভারতে … অনেক আগেই মনুর আইন লিখিত হয়েছিল। মনুস্মৃতিতে যেভাবে তার আইনসমূহ বিবৃত হয়েছে, তাকে এখনও সমগ্র পৃথিবী শ্রদ্ধার চোখে দেখে…। কিন্তু আমাদের সংবিধান-প্রণেতা পণ্ডিতদের কাছে তার কোনও মূল্য নেই।২৬

সঙ্ঘ পরিবার ও হিন্দু মহাসভার পথপ্রদর্শক সাভারকরও মনুস্মৃতির প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘‘আজও কোটি কোটি হিন্দু তাদের জীবনে ও কাজকর্মে যে সব নীতি-নিয়ম মেনে চলে, সেগুলির ভিত্তি হল মনুস্মৃতি। বর্তমানে মনুস্মৃতিই হল হিন্দু আইন।’’২৭ মনুস্মৃতির মতো এক ভয়াবহ পুরাণকে যদি ভারতের সংবিধানের বিকল্প হিসেবে খাড়া করা হয়, তবে কী ভয়ঙ্কর দিন ভারতের নারী এবং শূদ্র-অতিশূদ্র সহ সাধারণ জনগণের সামনে অপেক্ষা করে আছে তা অনুমানের বাইরে।

এককথায় বললে, ভারতে যে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আছে – যার থেকে আমজনতা ছিঁটেফোঁটা গণতন্ত্র পায় – সেই বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ফ্যাসিবাদীরা উৎখাত করার দিকে এগোচ্ছে। নাৎসিবাদী জার্মানি কিংবা ফ্যাসিবাদী ইতালিতে এই উৎখাতের ঘটনা ঘটে গিয়েছিল দেড় দশকের মধ্যে। ভারতে তারা কতদিন নেবে জানা নেই। প্রকৃতপক্ষে, ভারতে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে এক স্বৈরতান্ত্রিক ও সামগ্রিকতাবাদী শাসন প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে ভেতর ও বাইরে, দু’দিক থেকেই। একদিকে গড়ে তোলা হয়েছে এক দাঙ্গাহাঙ্গামা করা, মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো ঝটিকা বাহিনী – যারা বাইরে থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ভাঙছে। অন্যদিকে সাংবিধানিক ব্যবস্থা, সংসদীয় গণতন্ত্রের উপর ভেতর থেকে আক্রমণের প্রক্রিয়া চলছে (যেমন বিচারব্যবস্থা, আমলাতন্ত্র, নির্বাচন কমিশনকে কব্জা করা)। একজন মার্কসবাদী লেখক আইজাজ আহমেদ ভারতের ফ্যাসিবাদী উত্থান প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘‘রাষ্ট্রকে লক্ষণীয় মাত্রায় ভিতর থেকে দখল করা হয়েছে’’।২৮

এই প্রসঙ্গে আরও একটা কথা বলা দরকার। ভারতের ইতিহাস রচনায় অনুসন্ধানী, বৈজ্ঞানিক, বস্তুবাদী ঐতিহাসিকরা যে ভূমিকা রেখেছেন, তাকে মুছে ফেলে নতুন করে ইতিহাস রচনার কাজে সঙ্ঘ-চালিত কেন্দ্রীয় সরকার উদ্যোগী হয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামে সঙ্ঘের ও হিন্দু মহাসভার নক্কারজনক ভূমিকা মুছে ফেলা, উচ্চ বর্ণকে আর্যদের উত্তরসূরী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, মুসলমানদের বহিরাগত হিসেবে প্রমাণ করা, মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ নির্মাণের তত্ত্বকে মিথ্যা ভিত্তির উপর দাঁড় করানো, দেশবিভাগের সময় জনসঙ্ঘের ভূমিকাকে ভুলিয়ে দেওয়া, আদিবাসী দলিতদের এবং বৌদ্ধ, জৈন, শিখ ধর্মকে হিন্দু ধর্মের মধ্যে গ্রাস করা, গরুর নানান কল্পিত মাহাত্ম্য সহ বিভিন্ন ধরনের অপবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা, ইত্যাদি নানা ধরনের প্রকল্প সঙ্ঘ মতাদর্শবাহী ঐতিহাসিক, পুরাতত্ত্ববিদ, বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে পুরো দমে চলছে। এই কাজগুলিও হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।

হিটলারের জার্মানিতেও পোষ্য দার্শনিক, বিজ্ঞানী, ঐতিহাসিকদের দ্বারা জার্মান আর্য রক্তকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার কাজ চলেছিল। এমনকি বিশুদ্ধ জার্মান সন্তান তৈরি করার প্রকল্পও গৃহীত হয়েছিল। ভারতেও কি সেই রকম কিছু ঘটতে চলেছে?

কণ্ঠরোধের বর্ণপরিচয়

ভারতবর্ষে বুর্জোয়া সংসদীয় ব্যবস্থায় যে গণতন্ত্র বিরাজমান তা ব্যাপক ভাবে সংকুচিত, খণ্ডিত, খর্বিত। বস্তুত, একমাত্র উপরের স্তরের দশ-বিশ শতাংশ ক্ষীর-ননি প্রাপ্ত ধনী ব্যক্তিসমূহ এই গণতন্ত্র তুলনামূলক বেশি ভোগ করে। বাকি আশি শতাংশ জনগণ থাকে সরকার-মন্ত্রী-নেতা-দাদা-দিদিদের পায়ের তলায়। আইন-আদালত-আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা উচ্চ শ্রেণির কুক্ষিগত। তৃণমূল স্তরে যে পঞ্চায়েত, পুরসভা ব্যবস্থা আছে তারও সিংহভাগ উপভোগ করে উপরের স্তরের ধনী ও ক্ষমতাধর। সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের দাপটে সংখ্যালঘুরা সদা আতঙ্কিত। অতিশূদ্র বা দলিতদের উপর উচ্চ বর্ণের অত্যাচার অবর্ণনীয়। শূদ্র (ওবিসি) মানুষও উচ্চ বর্ণের প্রতাপে সশঙ্কিত। আদিবাসী মানুষের উপর বাবু-দিকু-পুলিশ-প্রশাসনের অত্যাচার-হুকুমদারি অব্যাহত। পুরুষপ্রভুত্বকারী ও পিতৃতান্ত্রিক সমাজের অভ্যন্তর থেকে হামেশাই শোনা যায় নিপীড়িত ধর্ষিত নারীদের আর্তনাদ। এইসব নিপীড়নের ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুলিশ-আমলাতন্ত্রের ভূমিকা উচ্চ শ্রেণি, উচ্চ বর্ণ ও পুরুষদের পক্ষে। আদালতে নিপীড়িত গরিব মানুষ যদি কোনও মতে পৌঁছায়, সেখানেও বিচার পক্ষপাতদুষ্ট। সংবাদমাধ্যমে এইসব নিপীড়ন অত্যাচারের কাহিনীর প্রকাশ খুবই সীমিত। ধনী শ্রেণির খবরই সেখানে অগ্রগণ্য। খুব সংক্ষেপে এই হল ‘বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের’ প্রকৃত পরিচয়।

বিস্ময়কর হল, এই সিকি-গণতন্ত্রও আজ আক্রান্ত। একের পর এক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন ভারতের গণতন্ত্রের পরীক্ষার খাতায় গোল্লা বসাচ্ছে। ২০১৯ সালে সিভিকাস মনিটর ভারতকে বলেছে এটি একটি ‘‘নিপীড়নমূলক রাজ’’।২৯ ২০২০ সালে ভি-ডেম রিপোর্ট জানিয়েছে ‘‘ভারতে শাসকদল প্রায় স্বৈরতন্ত্র চালাচ্ছে’’।৩০ ২০২১ সালে ভি-ডেম মনিটর বলেছে, ভারতে এখন ‘‘নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র’’ চলছে।৩১ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রিডম হাউসের সাম্প্রতিক রিপোর্ট জানাচ্ছে, ভারত এখন একটি ‘‘আংশিক মুক্ত’’ রাষ্ট্র যা ক্রমশ ‘‘কর্তৃত্ববাদী’’ হয়ে উঠছে।৩২ প্রখ্যাত সাপ্তাহিক ইকনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি (ইপিডবল্যু) সম্প্রতি লিখেছে,

… মোদী গণতন্ত্রকে সর্বাত্মকভাবে কণ্ঠরোধ করছে, মূলগতভাবে পৃথক একটি রাজনৈতিক শাসন সৃষ্টি করছে। ঊর্ধ্বস্থানীয় বিজেপি নেতারা শুধু কর্তৃত্ব করতেই চাইছে না, শুধু আধিপত্য করতেই চাইছে না, বরং এক বিরোধী-শূন্য ভারত তৈরি করতে চাইছে।… যখন তারা রাজ্যগুলির নির্বাচনে জিততে পারছে না এবং বিধায়কদের দলবদল করিয়ে ক্ষমতা দখল করছে, তাতে তারা শুধু বিরোধীদের তীব্র অবমাননা করছে না, ভোটদাতা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকেও অবমাননা করছে। মোদীর নতুন রাজনৈতিক শাসন সমস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিকে অধীনস্থ করেছে, বিকল্প ক্ষমতা কেন্দ্র গড়ে তুলেছে এবং স্বাধীন কণ্ঠস্বরকে রুদ্ধ করে এক স্বৈরতন্ত্র সৃষ্টি করেছে। গণতন্ত্রের উপর তথ্য সংগ্রহকারী একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা মোদীর ভারতকে ‘‘প্রথম দশটি স্বৈরতান্ত্রিক দেশের অন্তর্ভুক্ত করেছে।… সরকার রাজনৈতিক অধিকার এবং মানবিক অধিকার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, জমায়েত হওয়ার স্বাধীনতা, সরকারের সমালোচনা করার স্বাধীনতাকে খর্বিত করছে…।৩৩

ইপিডবল্যু উপরোক্ত নিবন্ধে আরও জানিয়েছে যে ‘‘নির্বাচন কমিশনকে দখল করা হয়েছে’’। এছাড়া, সামাজিক মাধ্যমের সাহায্যে ‘‘মিথ্যা সাম্প্রদায়িক প্রচার সেনাবাহিনীর নীচুতলায় ছড়ানো হয়েছে’’। ‘‘বিচারব্যবস্থাকে বশ করার প্রচেষ্টা অনেকখানি সফল হয়েছে’’। বেশির ভাগ ‘‘সংবাদমাধ্যমকে গাজর… ও লাঠি… ঝুলিয়ে বশংবদ করে তোলা হয়েছে’’। ‘‘সমালোচনামূলক রিপোর্টগুলিকে সতর্ক’’ করে দেওয়া হচ্ছে। ‘‘সম্পাদকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে তারা মোদী সম্পর্কে ইতিবাচক রিপোর্ট ছাপে’’, ইত্যাদি।৩৪

সংবাদমাধ্যমে এই অদৃষ্টপূর্ব প্রতিবেদন অনেক কিছুই স্পষ্ট করে দেয়। তা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপ প্রসঙ্গে আরও কয়েকটি কথা যোগ করা যায়। যেমন, গত দশকে ৯৬ শতাংশ দেশদ্রোহিতার কেস দেওয়া হয়েছে ২০১৪ সালের পর। এর মধ্যে ১৪৯ জনকে কেস দেওয়া হয়েছে মোদী সম্পর্কে ‘‘সমালোচনামূলক’’ ও ‘‘অবমাননাকর’’ মন্তব্য করার জন্য, একই ‘অপরাধে’ ১৪৪ জনকে কেস দেওয়া হয়েছে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথকে সমালোচনা করার জন্য।৩৫ ১৫০ জনের বেশি সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করে দেশদ্রোহিতা ও ইউএপিএ কেস দেওয়া হয়েছে।৩৬ সাংবাদিকদের যদি এই অবস্থা হয়, তবে সাধারণ মানুষের কী অবস্থা তা সহজেই অনুমেয়। সামাজিক মাধ্যম নগ্নভাবে শাসকদলের স্তাবকতা করে চলেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ২০২০ সালে জানিয়েছে হোয়াটসঅ্যাপ বিজেপির প্রতি স্পষ্ট আনুকুল্য দেখিয়ে চলছে। ঘৃণামূলক ও মিথ্যা সংবাদ ছড়ানোর মাধ্যম হয়ে উঠেছে হোয়াটসঅ্যাপ। ব্লুমবার্গের মতো প্রখ্যাত সংবাদমাধ্যম ২০১৭ সালে লিখেছে ফেসবুক কর্মচারীরা ‘‘কার্যত প্রচারকর্মী হয়ে উঠেছে’’।৩৭

বিজেপির কুখ্যাত আইটি সেল লক্ষ লক্ষ মিথ্যা সংবাদ প্রচার করে চলেছে। ২০১৮ সালে রাজস্থানের কোটায় অমিত শাহ দলীয় কর্মীদের এক সভায় সহাস্যে বলেছিলেন, উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে তারা ৩২ লক্ষ লোকের এক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ তৈরি করেছিলেন যারা ‘‘যে কোনও সংবাদ জনগণের সামনে উপস্থাপিত করতে সক্ষম… সত্য ও মিথ্যা’’।৩৮ ভীমা-কোরেগাঁও মামলায় যে বুদ্ধিজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের ইউএপিএ মামলায় গ্রেপ্তার করে রাখা হয়েছে, সম্প্রতি জানা গেছে তার মধ্যে রোনা জ্যাকব উইলসনের কমপিউটারে একটি ম্যালওয়্যার ঢুকিয়ে তার মধ্যে এমন কিছু ফাইল অনুপ্রবিষ্ট করা হয়েছে যার সঙ্গে মাওবাদী যোগ আছে।৩৯ ঐ কমপিউটারের তথ্যের ভিত্তিতে তাঁকে তো গ্রেপ্তার করা হয়েছেই, এছাড়া অন্যান্যদের ক্ষেত্রেও একই ষড়যন্ত্র করা হয়েছে কি না তা জানা নেই। এগুলি হল কণ্ঠরোধ করার প্রাথমিক পর্যায়। নতুন এক প্রাইভেসি বিল আনা হয়েছে যার মাধ্যমে কে বা কারা কোনও সংবাদ সামাজিক মাধ্যমে প্রথম লিখছে বা ছড়াচ্ছে তা ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ কর্তৃপক্ষকে বাধ্যতামূলকভাবে সরকারকে জানাতে হবে। সংবাদপত্র্রের উপরও কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। উপরন্তু, জেএনইউ, জামিয়া মিলিয়া, আলিগড়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের উপর সঙ্ঘের ঝটিকা বাহিনীর হামলা, এনআরসি বিরোধী প্রতিবাদী এবং কৃষক আন্দোলনের সমর্থকদের উপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও গ্রেপ্তার, দেশদ্রোহী কেস দেওয়া, ইত্যাদি এখন নিয়মিত ঘটনা। কথায় কথায় উগ্র জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ ছড়ানো হচ্ছে। কে তার পক্ষে, কে তার বিপক্ষে তা মাপা হচ্ছে। ‘হয় তুমি উগ্র জাতীয়তাবাদী, নয় তুমি দেশদ্রোহী’ এই ধরনের এক ভয়াবহ পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে।

উল্লেখযোগ্য হল, শুধু পুলিশি সন্ত্রাসই চলছে না। সঙ্ঘ পরিবার ১৯২৫ সাল থেকে, অর্থাৎ প্রায় একশো বছর ধরে যে আধা-সামরিক বাহিনী, দাঙ্গাহাঙ্গামা করার বাহিনী, নাৎসিবাদী কায়দায় হামলা চালানোয় দক্ষ ঝটিকা বাহিনী গড়ে তুলেছে (যার নক্কারজনক কাণ্ড ছিল বাবরি মসজিদকে ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেওয়া, গুজরাটে গণহত্যা ঘটানো), সেই বাহিনী এখন সন্ত্রাসের মাধ্যমে ঠিক করে দিচ্ছে কে কী করবে, কে কী খাবে, কে কী ভাববে, কে কী লিখবে, কে কী দেখবে, কে কোথায় যাবে, কে কাকে ভালবাসবে, ইত্যাদি। এগুলো শুধু চরম অগণতান্ত্রিক নয়, এগুলি হল ফ্যাসিবাদী কায়দায় মগজ ধোলাই। তোতাপাখির মতো ফ্যাসিবাদী শাসকদের শেখানো কথা বলানোর প্রথম ধাপ। প্রকৃতপক্ষে, এখনও পর্যন্ত যারা সবচেয়ে প্রতিবাদী ও সোচ্চার – বিশেষত বুদ্ধিজীবী, মানবাধিকার কর্মী, ছাত্র-যুব, সাংবাদিক – তাদের উপর ফ্যাসিবাদী আক্রমণ সবচেয়ে জোরালো। কিন্তু গণস্তরে বিক্ষোভ-আন্দোলন দেখা দিলে – যেমন কৃষক আন্দোলনের ক্ষেত্রে – সেখানেও তারা যে হামলা নামাতে প্রস্তুত তা তারা দেখিয়ে দিয়েছে। আগামীদিনে যারাই প্রতিবাদ প্রতিরোধে নামবে – শ্রমিক, আদিবাসী, দলিত, শূদ্র জনগণ, নারী – সবার জন্য শুধু রাষ্ট্রীয় যন্ত্রগুলি প্রস্তুত নয়, ঝটিকা বাহিনীকেও প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে।

জার্মানিতে গরিব, বেকার, ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের টাকার লোভ দেখিয়ে ব্রাউন শার্ট বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছিল (ইতালিতে ব্ল্যাক শার্ট বাহিনী)। এদের নাম ছিল এস.এ. অথবা ঝটিকা বাহিনী। রাস্তায় নেমে বিক্ষোভকারীদের মারধোর, খুন-জখম, মিটিং-মিছিল ভেঙ্গে দেওয়া, ইত্যাদি কার্যকলাপে তারা ছিল নাৎসিদের প্রথম সারির সৈনিক। অন্যদিকে নাৎসি একনায়কত্ব জনগণের ব্যক্তিগত অধিকারগুলি কেড়ে নিয়েছিল। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, জমায়েত করে প্রতিবাদ করার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। পদস্থ কর্মচারীদের চিঠিপত্র খুলে দেখা, টেলিফোনে আড়ি পাতা, কোনও ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেপ্তার করার অবাধ অধিকার দেওয়া হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, সমস্ত ধরনের সংবাদমাধ্যম, যেমন সংবাদপত্র, পত্রপত্রিকা, বই, প্রকাশ্য সভা-সমিতি, মিছিল, সংস্কৃতি, গান, সিনেমা, থিয়েটার, রেডিও সম্প্রচারকে হয় কড়া ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হত অথবা একেবারে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি নাৎসী বিরোধী বই পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। একমাত্র নাৎসিবাদী পত্রপত্রিকা, সিনেমা, নাটক, বই পড়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।৪০ ভারত কি সে পথেই এগোচ্ছে?

বাংলার নির্বাচন কী কর্তব্য উপস্থিত করেছে

জার্মানিতে ফ্যাসিবাদ তথা নাৎসিবাদের উত্থান ও বিকাশের অনেক কারণ আছে, এই আলোচনার পরিসর এখানে নেই। তবে ১৯১৮ সালে জার্মানিতে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রয়াস ব্যর্থ হওয়া ছিল অন্যতম বিশেষ কারণ। ফলে, শ্রমিকদের শক্তিশালী ইউনিয়নগুলিকে নাৎসিরা ধ্বংস করে দিতে পেরেছিল। এছাড়া, প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে জার্মানির পরাজয় এবং যুদ্ধোত্তর কালে শ্রমিক সহ সাধারণ জনগণের সামনে পরাজয়ের গ্লানি, জাতিদম্ভে জোরালো আঘাত, তীব্র বেকারি, চূড়ান্ত মূল্যবৃদ্ধি, হতাশা, মতাদর্শের জগতে শূন্যতা এবং সমাজতান্ত্রিক নামধারী সোশ্যাল ডেমোক্রাটদের বুর্জোয়াদের সঙ্গে হাত মেলানো, ইত্যাদি ছিল অন্যতম বিশেষ কারণ। এই হতাশাজনক পরিস্থিতিতে উদ্ভূত হয়েছিল হিটলারের নাৎসিবাদ। জনগণের দুর্দশার জন্য ইহুদিদের দায়ী করা হল। জার্মানির ‘গৌরবময়’ দিনগুলি ফিরিয়ে আনার একটানা প্রতিশ্রুতি ও স্বপ্ন দেখানো হল। ইহুদিদের বহিরাগত চিহ্নিত করে হয় দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হল, অথবা কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে মেরে ফেলা হল। সমস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিকে কুক্ষিগত করে নাৎসিবাদী একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করা হল। ১৯১৯ থেকে ১৯৩৩ – মোটামুটি এই চোদ্দ-পনেরো বছরের মধ্যে নাৎসিবাদী ক্ষমতা কায়েমের ভিত্তি প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল।

আরএসএস-এর জন্ম ১৯২৫ সালে। অর্থাৎ ভারতে ফ্যাসিবাদী প্রস্তুতিপর্ব প্রায় একশো বছর ধরে চলছে। বিশ্বের আর কোথাও এত দিনের প্রস্তুতিপর্ব লক্ষিত না হলেও তারা ক্রমে ক্রমে প্রবল শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ১৯৪৭-এ ‘স্বাধীনতা’-র আগে ও পরে নানা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাহাঙ্গামায় তারা এতদিন ধরে হাত পাকিয়েছে, হিন্দুত্ববাদ তথা ফ্যাসিবাদী মতাদর্শের প্রচার ও প্রসার ঘটিয়েছে। সঙ্ঘ পরিবারের মধ্যে আছে প্রায় অর্ধ শতাধিক সংগঠন, যারা সমাজের প্রতিটি স্তর ও অংশের মধ্যে তাদের মতাদর্শের বিস্তার ঘটিয়ে চলেছে, কাজ করে চলেছে। বিশেষত ১৯৮০-র দশক থেকে, যখন থেকে সমাজের নানা দ্বন্দ্বগুলি পেকে উঠে প্রাতিষ্ঠানিক কংগ্রেস দলকে ক্রমে ক্রমে ভগ্নদশার দিকে টেনে নিয়ে গেছে, তখন থেকে সঙ্ঘ পরিবারের পালে জোরদার হাওয়া লেগেছে। বিশেষ করে রামমন্দির ইস্যুকে সামনে রেখে ফ্যাসিবাদী সঙ্ঘের প্রচার ও কার্যক্রম ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠেছে।

ফ্যাসিবাদী শক্তি কতটা আগ্রাসী হতে পারে তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ হল সরকার, পুলিশ ও বিচারব্যবস্থার নাকের ডগায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসে ফ্যাসিবাদী ঝটিকা বাহিনীর তাণ্ডব এবং তার পরে লাগাতার দাঙ্গাহাঙ্গামা। বাবরি মসজিদ ধ্বংসে ও পরবর্তীকালে গুজরাট গণহত্যায়, নানা দাঙ্গাহাঙ্গামায় সঙ্ঘের সাফল্য দেখিয়ে দিয়েছে পুলিশ-আমলা-বিচারব্যবস্থা সজ্জিত কোনও সরকার এই ফ্যাসিবাদী অভিযানকে প্রতিহত করতে পারে না, পারবে না। বস্তুত, গত তিরিশ বছর ধরে ফ্যাসিবাদী সঙ্ঘ পরিবার ও বিজেপি-র মতাদর্শ ও কার্যক্রমের ক্রমবিস্তার ঘটেছে। কেন্দ্রে ও রাজ্যে একের পর এক সরকার এসেছে ও গেছে। কিন্তু ফ্যাসিবাদীরা তাদের শক্তি ও আঘাত করার ক্ষমতা ক্রমশ বর্ধিত করেছে বহুগুণে। এমনকি বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার অপরাধীদের আদালত নিষ্কৃতি দিয়েছে, ভেঙ্গে দেওয়া বাবরি মসজিদের স্থানে আদালতের আশীর্বাদে রামমন্দির গঠন দ্রুত তালে এগিয়ে চলেছে। সর্বোপরি ভারতের বড় বুর্জোয়া ও ধনী শ্রেণিগুলির কখনও প্রচ্ছন্ন, কখনও প্রত্যক্ষ সমর্থন ফ্যাসিবাদীদের ক্রমশ উদ্বুদ্ধ করেছে। শ্রমিক-কৃষক-কর্মচারী সহ সাধারণ জনগণের ক্ষোভবিক্ষোভ দমন করার ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদী বিজেপি যে সবচেয়ে দক্ষ তার প্রমাণ বারবার মিলেছে।

প্রকৃতপক্ষে, গত তিরিশ বছর ধরে সংসদীয় দলগুলির সামনে সঙ্ঘ পরিবার এক হিন্দুত্ববাদী গণ্ডি কেটে দিয়েছে। ভোটবাজ সংসদীয় দলগুলি কখনই ভোটের মোহে এই গণ্ডি অতিক্রম করার সাহস দেখাতে পারেনি। ফলে সংসদীয় সংগ্রাম হয়ে দাঁড়িয়েছে উগ্র হিন্দুত্ব বনাম কোমল হিন্দুত্বের মধ্যে লড়াই। কে বেশি হিন্দু তা প্রমাণ করার জন্য বিরোধী সংসদীয় দলগুলি প্রতিযোগিতায় সামিল হয়েছে বা হচ্ছে। সংসদীয় সংগ্রাম আবদ্ধ থেকেছে হিন্দু-মুসলমান সমীকরণের মধ্যে। উচ্চ বর্ণ এবং ক্রমে মাথা তুলে দাঁড়ানো শূদ্র-অতিশূদ্রের মধ্যে বিরোধও কোনও কোনও রাজ্যের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে বটে, কিন্তু প্রাধান্যের জায়গায় থেকে গেছে হিন্দুত্বের প্রশ্ন। যত এই হিন্দুত্বের প্রতিযোগিতা চলছে ততই সঙ্ঘের কড়াপাকের হিন্দুত্ব আরও পোক্ত হয়ে উঠছে। সে কংগ্রেস হোক, বাংলায় তৃণমূল কংগ্রেস হোক, হোক সে উত্তরপ্রদেশের সমাজবাদী পার্টি, বা দক্ষিণের তেলুগু দেশম কিংবা ডিএমকে – এরা সবাই এই গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ। এরা যত এই গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকছে, হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্তরা তাদের শক্তি বাড়িয়ে চলেছে। অর্থাৎ, হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ত মতাদর্শের বিস্তারে এদের সবারই কিছু না কিছু দায় আছে।

যে কংগ্রেস মুখে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে, তারা ‘স্বাধীনতা’র আগে ও পরে, যখন যেমন সুবিধা বুঝেছে হয় নরম-গরম হিন্দুবাদের আশ্রয় নিয়েছে অথবা মুসলমান ধর্মীয় নেতাদের তোষণ করেছে। ১৯৪৯ সালে বাবরি মসজিদের তালা ভেঙ্গে রামলালার মূর্তি বসানোর ঘটনা কংগ্রেস শাসনকালেই ঘটেছে। গত শতকের আশির দশকে মসজিদের ভিতর পূজার্চনা করার সুযোগ কংগ্রেস সরকারই করে দিয়েছে। শাহবানু মামলায় তারা মুসলমান মৌলবাদী নেতাদের যেমন তোষণ করেছে, তেমনই অন্যদিকে তার প্রতিক্রিয়ায় হিন্দুত্ববাদীদের হাত শক্ত করেছে। অজস্র দাঙ্গাহাঙ্গামায় হিন্দু ঝটিকা বাহিনীর প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকা রেখেছে। আর, রাষ্ট্রযন্ত্রকে কখনও এসমা, কখনও টাডা, কখনও ইউএপিএ ধারায় শাণিত করেছে। নিপীড়িত জাতিসত্বা সহ শ্রমিক-কৃষকের আন্দোলনগুলিকে ব্যাপকভাবে দমন করেছে, পুঁজিপতিদের শ্রেণি-শোষণের অভিযানকে দৃঢ় করেছে এবং পুঁজিপতি শ্রেণির থেকে দক্ষ প্রশাসকের সার্টিফিকেট পেয়েছে।

তৃণমূল কংগ্রেস এই কংগ্রেস থেকেই উদ্ভূত। ফলে মতাদর্শের প্রশ্নে অথবা পুঁজিপতি শ্রেণির স্তাবকতা করার প্রশ্নে তাদের শ্রেণিস্বার্থ কংগ্রেসের থেকে ভিন্ন কিছু নয়। শ্রমিক-কৃষক বিরোধী আন্দোলনগুলিকে দমনে তারা যে কম যায় না তা তারা গত দশ বছরে বারবার প্রমাণ করে দিয়েছে। গণ-আন্দোলনের কর্মীদের উপর ইউএপিএ জারি করতে তারা কোনও দ্বিধা করেনি। গরিবদের দান-খয়রাতির মোহে আবিষ্ট করে তাদের সংগ্রামী চেতনা জাগরণের সম্ভাবনাকে নষ্ট করছে। প্রতিটি সংসদীয় রাজনৈতিক দল যেভাবে দুর্নীতি, স্বজনপোষণ করে ছোট-বড় শিল্পপতির সেবা করে এবং নিজের পকেট ভরে, তৃণমূল কংগ্রেস দেখিয়ে দিয়েছে এ ব্যাপারেও তারা কম যায় না। মুসলমান মৌলবি ও হিন্দু পুরোহিতদের ভাতা তথা তোষণ করার মাধ্যমে তারাও যে প্রকৃতপক্ষে সাম্প্রদায়িক গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ তা প্রমাণ করে দিয়েছে। দিদিভাই-এর বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ মন্ত্রীসভা আলোকিত করার ঘটনা (যখন গুজরাটে গণহত্যা ঘটছে) ইতিহাসে এখনও জ্বলজ্বল করছে।

তথাকথিত বাম দলগুলি হিন্দুত্ববাদ প্রসারের বিরোধিতায় কখনই যোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেনি। বস্তুত, ১৯৭০-এর দশক থেকে সিপিআই-সিপিএম দলগুলির ক্রমশ ডান দিকে ঝুঁকে পড়া, শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনগুলির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা এবং ক্রমে ক্রমে সংসদীয় গদির মোহে আবিষ্ট হওয়ার ঘটনাবৃত্ত মতাদর্শের জগতে যে শূন্যস্থান সৃষ্টি করেছে তা হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ত অভিযানকে শক্তিশালী করেছে। এরা নামে ‘বাম’, কাজে বহুলাংশে ডান। বস্তুত, শ্রমিক-কৃষকের সংগ্রামের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দেওয়ার কাজে এরা বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছে। বর্তমানে বাংলার ভোটে তারা যেভাবে সাম্প্রদায়িক মুসলিম সংগঠনের হাত ধরেছে (কংগ্রেসের হাত ধরার কথা না হয় আপাতত বাদ দেওয়া গেল), তাতে তাদের গদির মোহ কতটা আবিষ্ট করে রেখেছে তা স্পষ্ট হয়ে গেছে। আবার অতীতে তারা বাজপেয়ীর হাত ধরতেও দ্বিধা করেনি। তারাও যে ফ্যাসিবাদী সঙ্ঘের হিন্দুত্বের গণ্ডির মধ্যে দৃঢ় আবদ্ধ তা প্রমাণিত হয়ে গেছে।

এছাড়া, আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের পরাজয়ের ব্যাপক প্রভাব এবং ভারতের শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনে ধস নামা ফ্যাসিবাদী মতাদর্শের বিস্তারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছে। শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলন পরাস্ত। বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবে কিছু ইউনিয়ন সংগ্রাম ছাড়া প্রকৃত অর্থে শ্রমিকদের মাথা তুলে দাঁড়ানোর কোনও ইঙ্গিত এখনও চোখে পড়ছে না। সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ শ্রমিকদের মধ্যে প্রায় মুছে গেছে। কিন্তু, ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনকে প্রতিহত করতে পারে প্রকৃত গণতান্ত্রিক চেতনা এবং সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা ও সংগ্রাম। সে জন্য রাশিয়া-চিন সহ বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে যে পরাজয় ও ভুলভ্রান্তি-বিচ্যুতি ঘটেছে তার নির্মোহ বিশ্লেষণ প্রয়োজন। দরকার সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা ও আন্দোলনের পুনরুজ্জীবন।

ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রামের মূল শক্তি হল কারখানার শ্রমিক ও গ্রামাঞ্চলের কৃষক সহ তামাম মেহনতী মানুষ। শ্রমিক এবং এই মেহনতী মানুষকে শুধু তাদের জীবন-জীবিকা রক্ষার সংগ্রামই গড়ে তুললে হবে না; তাদের দ্রুত সচেতন হতে হবে যে,  এই সংগ্রামগুলি এবং পুঁজিবাদ-কর্পোরেট বিরোধী সংগ্রাম যাতে গড়ে না উঠতে পারে সে জন্য হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্তরা একদিকে যেমন দাঙ্গাহাঙ্গামার বাহিনী গড়ে তুলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছে, অন্যদিকে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যে ছিঁটেফোঁটা গণতন্ত্র, কথা বলার স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মিছিল-মিটিং করার স্বাধীনতা টিকে আছে, তাকে একেবারে ধ্বংস করে দিতে চাইছে। শ্রমিকদের শ্রেণি-পরিচয়কে পুরোপুরি মুছে দিয়ে তাদের মধ্যে হয় হিন্দু কিংবা মুসলমান পরিচয় গেঁথে দিতে চাইছে। পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদকে শত্রু হিসেবে গণ্য করার পরিবর্তে মুসলমান ও খ্রিস্টান শ্রমিকভাইদের শত্রু করে তুলছে।

ইতিমধ্যে গ্রামাঞ্চলের কৃষক ভারতের কিছু রাজ্যে জেগে উঠেছে। তাদের ঐতিহাসিক আন্দোলনে ফ্যাসিবাদ বিরোধী উপাদান ক্রমশ প্রকাশ পাচ্ছে। কিন্তু শ্রমিকরা এখনও সংগ্রামের ময়দানে অনুপস্থিত। তাদেরকে উজ্জীবিত করতে হবে, তাদের কাছে প্রকৃত গণতান্ত্রিক আদর্শকে প্রোথিত করতে হবে। ফ্যাসিবাদী বিপদের প্রকৃত গুরুত্ব উন্মোচিত করতে হবে। এই কাজে বিপ্লবী, বৈজ্ঞানিক ও গণতান্ত্রিক চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা নিতে হবে।

ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনকে কোনও সরকার প্রতিহত করতে পারেনি। পারবেও না। খুব বেশি হলে বিজেপি-বিরোধী কোনও সরকার ফ্যাসিবাদ বিরোধী জনতাকে নিঃশ্বাস ফেলার তুলনামূলক সুযোগ দিতে পারে মাত্র। সুতরাং বাংলার নির্বাচনে বিজেপিকে পরাস্ত করা এই নিঃশ্বাস ফেলার একটু সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু, শ্রমিক-কৃষকের সংগ্রাম সংগঠিত করার কাজে এবং ফ্যাসিবাদী বিপদ সম্পর্কে তাদের সচেতন করে তোলার কাজে অবহেলা চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগও হাতছাড়া হবে। বরং ফ্যাসিবাদ কণ্ঠ রুদ্ধ করবে। ডিটেনশন ক্যাম্পগুলি নাৎসিবাদী কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পরিণত হওয়া খুব কিছু কঠিন নয়।

তাই বাংলার নির্বাচন যে প্রচারের সুযোগ এনে দিয়েছে তাকে ব্যবহার করে শ্রমিক-কৃষকের ফ্যাসিবাদ বিরোধী সচেতন সংগ্রাম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ এই মুহূর্তে বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক, বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিবাদীদের কাছে প্রধান কাজ। তার সঙ্গে ভোট যেন বিজেপির পক্ষে না যায় তার জন্যও প্রচার করতে হবে। এই প্রচারটাও দরকার বাংলায় আপাতত কিছুটা নিঃশ্বাস ফেলার জন্য।

সূত্র:

১) http://articles.economictimes.indiatimes.com/2013-09-06/news/41835249_1_narendra-modi-pm-candidate-rahul-gandhi; ০৬.০৯.২০১৩, সংগৃহীত ১৫.১০.২০১৩।

২) http://articles.economictimes.indiatimes.com/2013-09-14/news/42062471_1_gujarat-model-development-model-narendra-modi; ১৪.০৯.২০১৩, সংগৃহীত ১৫.১০.২০১৩।

৩) সূত্র ৩ দেখুন।

৪) https://theprint.in/politics/rss-in-modi-govt-in-numbers-3-of-4-ministers-are-rooted-in-the-sangh/353942/; ২৭.০১.২০২০, সংগৃহীত ১৫.০২.২০২১।

৫) https://scroll.in/article/668169/bureaucrats-rush-to-rss-office-to-prove-their-loyalty-to-modi; ২৬.০৬.২০১৪, সংগৃহীত ১৫.০২.২০২১।

৬) https://www.ndtv.com/india-news/government-attempting-to-appoint-rss-people-in-judiciary-kapil-sibal-1830901; ৩০.০৩.২০১৮, সংগৃহীত ০১.০৫.২০২০।

৭) https://economictimes.indiatimes.com/news/economy/policy/the-shape-of-indias-selloff-plan-300-psus-may-shrink-to-barely-two-dozen/articleshow/80741438.cms; ০৮.০২.২০২১, সংগৃহীত ০৯.০২.২০২১।

৮) ফস্টার, জন বেলামি; নিওফ্যাসিজম ইন দ্য হোয়াইট হাউস, মান্থলি রিভিউ, এপ্রিল ২০১৭।

৯) https://scroll.in/latest/911462/unemployment-was-at-45-year-high-after-note-ban-shows-centres-buried-report-business-standard; ৩১.০১.২০১৯, সংগৃহীত ৩১.১২.২০১৯।

১০) https://scroll.in/latest/943803/consumer-spending-fell-for-first-time-since-1970s-in-2017-18-report-withheld-business-standard; ১৫.১১.২০১৯, সংগৃহীত ৩১.১২.২০১৯।

১১) উইলিয়ম এল শিয়ারার, দ্য রাইজ অ্যান্ড ফল অব দ্য রাইখ, (ফিউসেট ক্রেস্ট, নিউ ইয়র্ক, ১৯৬২), পৃঃ ৪০।

১২) অর্গানাইজার, ০২.০১.১৯৬১।

১৩) https://indianexpress.com/article/india/brahmins-are-superior-by-birth-says-lok-sabha-speaker-om-birla-5983575/; ১১.০৯.২০১৯, সংগৃহীত ১১.০৯.২০১৯।

১৪) এম এস গোলওয়ালকর, উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইনড, (নাগপুর: ভারত পাবলিকেশনস, ১৯৩৯), পৃঃ ৪৭-৪৮।

১৫) https://encyclopedia.ushmm.org/content/en/article/defining-the-enemy; সংগৃহীত ১৪.১২.২০১৯।

১৬) সূত্র ১৩ দেখুন, পৃঃ ২৭।

১৭) আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৮.০৯.২০১৯।

১৮) গোলওয়ালকর সমগ্র, খঃ ১, পৃঃ ২৮; https://countercurrents.org/2017/01/17/anti-national-rss-documentary-evidences-from-rss-archives/; ১৭.০১.২০১৭, সংগৃহীত ১১.০৯.২০১৮।

১৯) নিউম্যান, ফ্রান্জ, বেহেমথ: দ্য স্ট্রাকচার অ্যান্ড প্র্যাকটিস অব ন্যাশনাল সোশ্যালিজম (ইভান আর শিকাগো, ১৯৭২), পৃঃ ৫১।

২০) https://www.thehindu.com/news/national/world-witnessing-new-era-of-authoritative-leadership-ram-madhav/; ০৫.১০.২০১৯, সংগৃহীত ০৭.১০.২০১৯।

২১) https://www.asianage.com/opinion/edit/280919/is-constitution-anti-hindu-or-the-rss-anti-indian.html; ২৯.০৯.২০১৯, সংগৃহীত ৩০.০৯.২০১৯।

২২) পূর্বোক্ত।

২৩) পূর্বোক্ত।

২৪) https://www.firstpost.com/india/india-hindu-rashtra-favourable-time-organise-hindus-bhagwat-2088553.html; সংগৃহীত ১৪.০৮.২০১৯।

২৫) https://www.indiatoday.in/india/story/india-is-a-hindu-rashtra-it-is-non-negotiable-rss-chief-mohan-bhagwat-1605313-2019-10-0; ০১.১০.২০১৯, সংগৃহীত ০৭.১০.২০১৯।

২৬) https://countercurrents.org/2017/01/17/anti-national-rss-documentary-evidences-from-rss-archives/; ১৭.০১.২০১৭, সংগৃহীত ১১.০৯.২০১৮।

২৭) ‘উইমেন ইন মনুস্মৃতি’, সাভারকর সমগ্র, খঃ ৪, পৃঃ ৪১৬; শামসুল ইসলাম, আরএসএস: একটি প্রাথমিক পরিচয় (কলকাতা: বুকমার্ক)।

২৮) https://mronline.org/2019/07/22/a-conversation-with-aijaz-ahmad-the-state-is-taken-over-from-within/; ২২.০৭.২০১৯, সংগৃহীত ২৪.০৭.২০১৯।

২৯) https://thewire.in/rights/india-civic-space-repressed-civicus-monito; ০৫.১২.২০১৯, সংগৃহীত ০৬.১২.১৯।

৩০) https://scroll.in/article/977031/bjp-now-closely-resembles-a-typical-governing-party-in-an-autocracy-claims-a-new-study; ২৯.১০.২০২০, সংগৃহীত ২৩.০২.২০২১।

৩১) https://thewire.in/rights/india-no-longer-democracy-electoral-autocracy-v-dem-institute-report-bjp-narendra-modi; ১২.০৩.২০২১, সংগৃহীত ১২.০৩.২০২১।

৩২) দ্য টেলিগ্রাফ, ০৪.০৩.২০২১।     

৩৩) https://www.epw.in/engage/article/new-fundamentally-different-political-order; ০২.০৩.২০২১, সংগৃহীত ০৪.০৩.২০২১।

৩৪) পূর্বোক্ত।

৩৫) https://scroll.in/latest/985724/96-sedition-cases-filed-against-405-people-after-bjps-2014-victory-shows-new-article-14-database; ০২.০২.২০২১, সংগৃহীত ০৪.০২.২০২১।

৩৬) https://www.counterview.net/2021/02/20-of-firs-against-journalists-in-2020.html; ১৫.০২.২০২১, সংগৃহীত ১৫.০২.২০২১।

৩৭) https://scroll.in/article/970544/why-the-allegations-about-facebook-bjp-links-are-so-significant-for-indian-politics; ১৭.০৮.২০২০, সংগৃহীত ১২.০৯.২০২০।

৩৮) https://thewire.in/politics/amit-shah-bjp-fake-social-media-messages; ২৬.০৯.২০১৮, সংগৃহীত ২১.১২.২০১৯।

৩৯) https://scroll.in/latest/986517/bhima-koregaon-key-evidence-against-accused-activists-was-planted-using-malware-says-report; ১০.০২.২০২১, সংগৃহীত ১৫.০২.২০২১।

৪০) https://encyclopedia.ushmm.org/content/en/article/nazi-rule?series=21810; সংগৃহীত ১৪.১২.২০১৯।

 

 

 

 

 

Tags :